রাইড শেয়ারিং অ্যাপভিত্তিক চালকরা প্ল্যাটফর্ম কোম্পানির কমিশন কমিয়ে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ নির্ধারণের দাবি করেছে।
‘রাইড শেয়ারিং নীতিমালা ২০১৭’-এর (সংশোধিত ২০২৫) খসড়া পুনর্মূল্যায়নের জন্য বুধবার বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কক্ষে এক সভায় তারা ভাড়া কাঠামো পুনর্নির্ধারণ, প্রতি কিলোমিটারে ভাড়ার সর্বনিম্ন-সর্বোচ্চ সীমা ঠিক করা, মোটরসাইকেলের ওয়েটিং চার্জ এক টাকা নির্ধারণ এবং অনিবন্ধিত ইনড্রাইভের কার্যক্রম বন্ধেরও দাবি জানিয়েছেন।
চালকদের সংগঠনগুলো জানায়, উবার শহরে ২৫ শতাংশ ও বাইরে ২২ শতাংশ কমিশন কেটে নেয় এবং পাঠাও ৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন চার্জ করে, যা সরাসরি তাদের আয়ের ওপর বড় চাপ তৈরি করছে।
সংশোধিত রাইড শেয়ারিং নীতিমালার খসড়ায় কমিশন ১৫ শতাংশ করার প্রস্তাব থাকলেও চালকদের তাদের মতে আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য রাখতে এটি আরও কমিয়ে ১০ শতাংশ করা প্রয়োজন।
সভায় বিআরটিএ কর্মকর্তারা বাঁচাও রাইড পরিষেবা ঐক্য পরিষদ, জাতীয় শ্রমিক শক্তি এবং ঢাকা রাইড-শেয়ারিং ড্রাইভারস ইউনিয়নের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করেন।
আলোচনায় নতুন নীতিমালার ভাড়া কাঠামো, কমিশন হার ও চালকদের ন্যায্য আয় নিশ্চিত করার মতো বিষয়গুলো উঠে আসে।
সভায় সাত সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয় যাতে তিনটি সংগঠনের একজন করে প্রতিনিধি, বিআরটিএর তিনজন কর্মকর্তা এবং কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশনের একজন প্রতিনিধি থাকবেন।
কমিটিকে ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে প্রস্তাবনাটি পুনর্বিবেচনা করে নতুন খসড়া প্রস্তুত করতে বলা হয়, যাতে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো প্রস্তাবনায় কোথায় অসংগতি ছিল এবং কোথায় নতুন কিছু যোগ হওয়া প্রয়োজন তা স্পষ্ট করা যায়।
চালকদের দাবিগুলো নতুন নয়। অ্যাপভিত্তিক রাইড শেয়ারিং প্লাটফরমগুলোর চালকদের সমন্বয়ে গঠিত বাঁচাও রাইড পরিষেবা ঐক্য পরিষদ গত কয়েক বছর ধরে ভাড়া সংক্রান্ত অনুচ্ছেদ ও নীতিমালা সংস্কারের দাবি জানিয়ে আসছে।
এই দাবির ধারাবাহিকতায় ২৫ আগস্ট ২০২৫ বিআরটিএ ভবনে বিআরটিএ, ঐক্য পরিষদ এবং বিভিন্ন অ্যাপ কোম্পানির প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি সভা হয়, যেখানে ন্যায্য পারিশ্রমিক, ভাড়া পুনর্নির্ধারণ এবং আইনি সমস্যার সমাধান নিয়ে আলোচনা হয়।
এই আলোচনা ও আপত্তির ভিত্তিতে বিআরটিএ ২ নভেম্বর ২০২৫ ‘রাইড শেয়ারিং সার্ভিস নীতিমালা ২০১৭ (সংশোধিত ২০২৫)’ সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে পাঠায়।
কিন্তু ভাড়া কাঠামোসহ কয়েকটি বিষয়ে চালকদের আপত্তি থাকায় তারা বিআরটিএ চেয়ারম্যান ও মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার কাছে পুনর্বিবেচনার আবেদন করেন, যাতে নীতিমালায় তাদের অভিজ্ঞতাও প্রতিফলিত হয়।
রাইড শেয়ারিং নীতিমালা ২০১৭-তে ২০১০ সালের ট্যাক্সি ভাড়া কাঠামো অনুসরণের কথা বলা ছিল এবং সর্বোচ্চ কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া ৩৪ টাকা নির্ধারণ করা হয়।
কিন্তু সর্বনিম্ন ভাড়ার সীমা না থাকায় কোম্পানিগুলো প্রতিযোগিতায় ভাড়া কমাতে থাকে এবং এর ফলে চালকদের আয় ক্রমশ কমে যায়। তাই এখন সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ রেঞ্জ নির্ধারণকে চালক সংগঠনগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে।
ঐক্য পরিষদের প্রেস সচিব মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ আল মারুফ টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, রাইড শেয়ারিং পরিষেবা ট্যাক্সি সার্ভিসের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হলেও আগের নীতিমালায় ক্যাটাগরি অনুযায়ী ভাড়ার কাঠামো ছিল না।
তিনি জানান, মোটরসাইকেলের ওয়েটিং চার্জ পাঠাওতে ৫০ পয়সা ছিল এবং উবারে ছিল না, যেখানে চালকরা ১ টাকা দাবি করেন। নতুন খসড়ায় এই দাবি গ্রহণ করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, কিলোমিটারপ্রতি ভাড়ার ক্ষেত্রে প্রথমে ১৮ টাকা প্রস্তাব করা হলেও পরে তা কমিয়ে ১৬ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা চালকদের আয়ের ন্যূনতম নিরাপত্তা তৈরিতে সহায়ক হবে।
তার মতে, ন্যূনতম ভাড়া নিশ্চিত হলে চালকরা অ্যাপের বাইরে কাজ করবেন না, ফলে যাত্রীও নিরাপদ থাকবে এবং রাইড শেয়ারিং একটি স্থায়ী আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থা হিসেবে গড়ে উঠবে।
মারুফ অভিযোগ করেন, উবার ভাড়া কমালে পাঠাও বাধ্য হয়ে তা অনুসরণ করছে এবং এখন পাঠাও অ্যাপে ভাড়ার বিস্তারিত আর দেখায় না, বরং শুধু আনুমানিক ভাড়া দেখায়, ফলে যাত্রীরা বুঝতে পারেন না কত কিলোমিটার চলা হলো, কত সময় লাগলো বা প্রতি কিলোমিটারে কত টাকা ভাড়া নির্ধারিত হলো।
চালক সংগঠনগুলো ইনড্রাইভের কার্যক্রম বন্ধের দাবি তোলে। কারণ, এটি একটি রাশিয়ান কোম্পানি, যা বিআরটিএর কোনো রেজিস্ট্রেশন ছাড়া দীর্ঘদিন দেশজুড়ে সেবা চালাচ্ছে।
তারা বলেন, রেজিস্ট্রেশন না থাকায় ইনড্রাইভ জরুরি প্রয়োজনে ৯৯৯-এর সঙ্গেও যুক্ত হতে পারে না, যা যাত্রী নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি।
অন্যদিকে পাঠাও, উবার ও ওভাইয়ের মতো প্ল্যাটফরমগুলো বিআরটিএর কাছ থেকে নিয়মিত রেজিস্ট্রেশন নিয়েছে এবং কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে।
ঐক্য পরিষদ জানায়, প্রায় আট বছর পর যে নতুন নীতিমালার খসড়া তৈরি হচ্ছে তা যেন যুগোপযোগী, বাস্তবসম্মত এবং অস্পষ্টতামুক্ত হয়।
তারা মনে করে, এতে যাত্রীসেবা নিশ্চিত হবে এবং রাইডাররা আরও স্মার্ট, নিরাপদ ও সংগঠিত পরিবহন সুবিধা পাবেন।
রাইড শেয়ারিং অ্যাপ কোম্পানিগুলো আগামী রোববার বিআরটিএর সঙ্গে আলোচনায় বসবে, যেখানে নীতিমালার পরবর্তী সংস্করণ নিয়ে কোম্পানিগুলোর মতামতও উপস্থাপিত হবে।